২১ আগস্ট ২০২৪, বিকেল ৩টা। ফেনী সদর হাসপাতালের তৃতীয় তলা থেকে হঠাৎ চিৎকার চেঁচামেচি শুনে নিচে নেমে আসেন ফারাহ্ বিনতে সালেক (৪৬)। হাসপাতালের ভেতর তখন হাঁটুপানি। অসুস্থ মাকে নিয়ে বনানী পাড়ার বাসায় ফিরে দেখেন, নিচতলায় বুকসমান পানি। প্রবল স্রোতে ভেসে যাচ্ছে মানুষ, গবাদিপশু, ঘরবাড়ি।

“আগে কখনো এমন বন্যা দেখিনি”, বলেন ফারাহ্। “মুহুরী নদীর বাঁধ খুলে দেওয়ায় আমাদের ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে।” ২০২১ সালে করোনায় স্বামী হারানো ফারাহ্ আবারও বাকরুদ্ধ।
এই চিত্র শুধু ফারাহর একার নয়। কালীদাহ ইউনিয়নের হারেজ চৌধুরী (৭৬) ও ছনুয়া গ্রামের সবুরা খাতুন (৭০) দুজনেই সেদিন রাতে সর্বস্ব হারিয়ে প্রতিবেশীর বহুতল ভবনে আশ্রয় নেন। চোখের সামনে বিলীন হয়েছে গ্রাম, জীবন আর স্মৃতি।
২০২৪ সালের আগস্ট বন্যা: এক নজরে ক্ষয়ক্ষতি
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২১ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া আকস্মিক বন্যায় মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, ফেনী, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলা প্লাবিত হয়।

ফেনী ও কুমিল্লার বন্যাকে ৩৬ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বলা হচ্ছে। ২৬ আগস্ট পর্যন্ত ২৩ জনের মৃত্যু ও প্রায় ৫৭ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বন্যার নেপথ্যে: শুধুই কি অতিবৃষ্টি?
ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান বন্যার অন্যতম কারণ। কিন্তু ২০২৪ সালের ফ্ল্যাশ ফ্লাডের পেছনে উজানে নির্মিত বাঁধের গেট খুলে দেওয়ার প্রভাবকে বিশেষজ্ঞরা উড়িয়ে দিচ্ছেন না।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের ২০২৩ সালের খসড়া তালিকা অনুযায়ী, বাংলাদেশে নদ-নদীর সংখ্যা ৯০৭টি। এর মধ্যে আন্তঃসীমান্ত নদী ৫৭টি—ভারতের সঙ্গে ৫৪টি, মিয়ানমারের সঙ্গে ৩টি। এই ৫৪টি অভিন্ন নদীই দুই দেশের ৬২ কোটি মানুষের জীবনরেখা।
উজানে বাঁধের জাল: শুষ্ক মৌসুমে খরা, বর্ষায় বন্যা
ঢাকা পোস্টে প্রকাশিত ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত আন্তঃসীমান্ত স্বীকৃত ৫৪টি নদীর ৩৬টির ওপরই মোট ৫৪টি বাঁধ ও ব্যারেজ নির্মাণ করেছে। শুধু গঙ্গা অববাহিকায় ভারতের বাঁধের সংখ্যা ১৮০টির বেশি। তিস্তা নদীর ওপরেই রয়েছে ১০টির বেশি বাঁধ-ব্যারেজ, নির্মাণাধীন আরও ৫টি।

এর ফল দ্বিমুখী।
শুষ্ক মৌসুমে: ফারাক্কাসহ উজানের বাঁধগুলো পানি আটকে রাখায় পদ্মা-তিস্তা অববাহিকার ৩০টি জেলার প্রায় ৭০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা মরুকরণের ঝুঁকিতে। শত শত শাখা নদী ও খালবিল শুকিয়ে যাচ্ছে। কৃষি ও নৌ-পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বর্ষা মৌসুমে: উজানে অতিবৃষ্টি হলে বাঁধের নিরাপত্তার জন্য গেট খুলে দেওয়া হয়। তখন নদীর স্বাভাবিক ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি পানি একসাথে ভাটিতে নামে। ২০২৪ সালের ফেনী-কুমিল্লা বিপর্যয় এর সর্বশেষ উদাহরণ।
১৯৭৫ সালে ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর থেকে উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পদ্মা এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২০-২৫টি নদী, অসংখ্য খাল-জলাশয় ও জমির উর্বরতা হারিয়েছে। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হচ্ছে। অথচ তিস্তাসহ বাকি ৫৩টি নদীর পানি বণ্টন চুক্তি আজও হয়নি।
নদীতে বাঁধের পরিবেশগত প্রভাব: এক নীরব ঘাতক
বাঁধ শুধু পানি আটকায় না, একটি সম্পূর্ণ ইকোসিস্টেম ধ্বংস করে। এর প্রধান প্রভাবগুলো হলো—
১. জীববৈচিত্র্য ধ্বংস: বাঁধ মাছের প্রজনন পরিযান বন্ধ করে দেয়। ইলিশসহ দেশীয় মাছের উৎপাদন কমছে।
২. নদীর মৃত্যু: উ জানে পলি আটকে যাওয়ায় ভাটিতে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে নাব্যতা হারাচ্ছে। আবার বাঁধের ভাটিতে তীব্র স্রোতে নদীভাঙন বাড়ছে।
৩. লবণাক্ততা বৃদ্ধি: শুষ্ক মৌসুমে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা ঢুকে কৃষিজমি অনুর্বর করছে।
৪. ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিম্নগামী: নদী শুকিয়ে যাওয়ায় রাজশাহী-রংপুর অঞ্চলে পানির স্তর বিপজ্জনকভাবে নিচে নেমেছে।
ভবিষ্যৎ ঝুঁকি ও করণীয়
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ৮ মাত্রার ভূমিকম্প বা বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে উজানের বাঁধগুলো ভেঙে পড়লে বাংলাদেশের জন্য তা হবে মহাবিপর্যয়। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহপথই পাল্টে যেতে পারে।
এই সংকট মোকাবিলায় তিনটি স্তরে জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন:
১. দ্বিপাক্ষিক কূটনীতি জোরদার: ৫৪টি অভিন্ন নদীর সবগুলোর জন্য ন্যায্য হিস্যার ভিত্তিতে পানি বণ্টন চুক্তি করতে হবে। তিস্তা চুক্তি অবিলম্বে স্বাক্ষর জরুরি। বাঁধের গেট খোলার আগে বাধ্যতামূলকভাবে বাংলাদেশকে আগাম তথ্য দেওয়ার প্রটোকল মানতে ভারতকে বাধ্য করতে হবে।
২. আঞ্চলিক ফোরাম গঠন: নদী কোনো একক দেশের সম্পত্তি নয়। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান ও চীনকে নিয়ে ‘গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বেসিন ব্যবস্থাপনা কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব জোরালো করতে হবে।
৩. আন্তর্জাতিকীকরণ: ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘ পানিপ্রবাহ কনভেনশন অনুযায়ী উজানের দেশ একতরফাভাবে ভাটির দেশের ক্ষতি করতে পারে না। ভারতের একপেশে বাঁধ নির্মাণ ও পানি প্রত্যাহারের বিষয়টি আন্তর্জাতিক ফোরামে তুলে ধরতে হবে।
নদী বাংলাদেশের অর্থনীতির ধমনী। কৃষি, মৎস্য, নৌ-পরিবহন, পরিবেশ—সবকিছু নদীর ওপর দাঁড়িয়ে। এই ধমনীকে শুকিয়ে মারা বা হঠাৎ ফুলিয়ে ডুবিয়ে দেওয়া—দুটোই আগ্রাসন।
আগামী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য বাংলাদেশ নিশ্চিত করতে হলে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে সরকারকে এখনই সমন্বিত, শক্তিশালী ও কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হবে। মেধা, মনন ও চিন্তাশক্তি দিয়ে পানির অধিকার রক্ষাই হোক আমাদের জাতীয় ব্রত।
তথ্যসূত্র: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, ২০২৪; জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন, ২০২৩; ঢাকা পোস্ট, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪; বণিক বার্তা, ৩১ আগস্ট ২০২৪।