কোরবানির পশুর চামড়া: সিন্ডিকেটের গ্রাসে গরিবের হক
মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মনির
কলামিস্ট ও ফিচার লেখক
ঈদুল আজহার কোরবানির চামড়া শুধু পণ্য নয়, এটি হাজার হাজার গরিব, এতিম, এতিমখানা ও মাদ্রাসার বার্ষিক আয়ের প্রধান উৎস। শরীয়ত অনুযায়ী এটি গরিবের হক। এক সময় এই চামড়া বিক্রি করে একটি মাদ্রাসা সারা বছরের খরচ চালাত। কিন্তু গত ৮-১০ বছরে চিত্র বদলে গেছে। চামড়ার দাম এখন “পানির দামে” ঠেকেছে, অথচ চামড়াজাত পণ্যের দাম কমেনি।
১. সেকাল: যখন চামড়ার মূল্য ছিল
২০১০ সাল পর্যন্ত চামড়া ছিল বাংলাদেশের ৩য় বৃহত্তম রপ্তানি খাত। ২০১৪ অর্থবছরে চামড়া রপ্তানি ছিল ৩৯৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
তখন একটি মাঝারি গরুর চামড়া ১২০০-১৮০০ টাকায় বিক্রি হতো। মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো নিজেরাই চামড়া সংগ্রহ করে বিক্রি করত।
২. একাল: পানির দামে গরিবের হক
২০২৪-২০২৫ সালে চিত্র পাল্টেছে:
দামের পতন: ঢাকায় লবণ দেওয়া গরুর চামড়া সরকার নির্ধারণ করেছিল ১৩৫০ টাকা, ঢাকার বাইরে ১১৫০ টাকা। কিন্তু বাস্তবে বিক্রি হয়েছে ৩০০-৬০০ টাকা। ছাগলের চামড়া ৫-১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, অনেক জায়গায় বিনামূল্যে দিতে হয়েছে।
অপচয়: চট্টগ্রামে ২২টি গরু কোরবানির পরও ক্রেতা না পেয়ে চামড়া এতিমখানায় দান করতে হয়েছে। সিপিডির মতে ২১% চামড়া খারাপ কাটার কারণে অর্ধেক দামে বিক্রি হয়েছে।
মাদ্রাসার ক্ষতি: মৌলভীবাজারে এতিমখানা ও মাদ্রাসার চামড়া ২৫০-৩০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

৩. কেন দাম কমল?
১. সাভার ট্যানারি প্রকল্পের ব্যর্থতা
২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি সরানো হয় পরিবেশ দূষণ ঠেকাতে। কিন্তু সেন্ট্রাল এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট CETP এখনও অকার্যকর। CETP-এর ক্ষমতা ১৪,০০০ ঘনমিটার/দিন, কিন্তু পিক সিজনে লাগে ৩৫,০০০ ঘনমিটার। ফলে অপরিশোধিত বর্জ্য ধলেশ্বরী নদীতে যাচ্ছে।

২. LWG সার্টিফিকেশন না পাওয়া
LWG Leather Working Group সার্টিফিকেশন ছাড়া ইউরোপ-আমেরিকার বড় ব্র্যান্ডরা বাংলাদেশের চামড়া কেনে না। বাংলাদেশে মাত্র ৬-১০টি কারখানার LWG সার্টিফিকেশন আছে। ভারতে আছে ৩৩৪টি, পাকিস্তানে ৬২টি।
৩. সিন্ডিকেট
পোস্তার আড়তদাররা সিন্ডিকেট করে দাম কমিয়ে দেয়। ২০২৪ সালে ট্যানারিদের কাছে পাওনা ছিল ৩৫০ কোটি টাকা, যা পরিশোধ হয়নি।
৪. বৈপরীত্য: চামড়ার দাম কমলেও পণ্যের দাম বাড়ল
চামড়ার দাম কমলেও জুতা, ব্যাগ, বেল্টের দাম বাড়ছে। কারণ:
– আমরা কাঁচা ও semi-processed wet blue চামড়া ৬০% কম দামে চীনে রপ্তানি করি।
– ফিনিশড পণ্য বিদেশে তৈরি হয়ে চড়া দামে ফিরে আসে।
– ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ফুটওয়্যার রপ্তানি ১.১৯ বিলিয়ন ডলার, কিন্তু ফিনিশড লেদার মাত্র ৭%।
৫. অর্থনৈতিক প্রভাব
রপ্তানি পতন: ২০১৪ সালে চামড়া রপ্তানি ছিল ৩৯৭ মিলিয়ন ডলার, ২০২৪ সালে কমে হয়েছে ১৪২.৫৪ মিলিয়ন ডলার। ১০ বছরে পতন ৬৪%।
সম্ভাব্য ক্ষতি: LWG সার্টিফিকেশন না থাকায় বছরে ৫০০ মিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় হারাচ্ছে বাংলাদেশ।
গরিবের আয় কমেছে: প্রায় ৩০,০০০ মাদ্রাসা ও এতিমখানার আয় ৬০-৭০% কমেছে।
৬. উত্তরণের পথ
স্বল্পমেয়াদী
1. সরকার নির্ধারিত দাম কার্যকর করতে জেলা প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে। ২০২৫ সালে সরকার বলেছিল গরুর চামড়ার ন্যায্য দাম ১২০০ টাকা নিশ্চিত করবে।
2. মাদ্রাসা ও এতিমখানাকে সরাসরি ট্যানারির সঙ্গে যুক্ত করতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করা।
মধ্যমেয়াদী
1. সাভারের CETP দ্রুত কার্যকর করে LWG সার্টিফিকেশন নিতে হবে।
2. শর্তসাপেক্ষে কাঁচা চামড়া রপ্তানির সুযোগ দিতে হবে যাতে প্রতিযোগিতা বাড়ে।
দীর্ঘমেয়াদী
1. ফিনিশড লেদার ও ফুটওয়্যার রপ্তানিতে জোর দিতে হবে। বিশ্ব বাজারের আকার ৪৪০ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের সম্ভাবনা ১০ বিলিয়ন ডলার।
2. সমবায় ভিত্তিক চামড়া সংগ্রহ ও প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণ।
উপসংহার
কোরবানির চামড়া গরিবের হক। এই হক মারা যাওয়া মানে সামাজিক ন্যায়বিচারের উপর আঘাত। সিন্ডিকেট, নীতি ব্যর্থতা ও পরিবেশগত অকার্যকারিতা মিলে আজ চামড়া শিল্প সংকটে।
সরকার, ট্যানারি মালিক, মাদ্রাসা ও নাগরিক সমাজ একসাথে কাজ করলে চামড়া আবার গরিবের আশীর্বাদ হতে পারে। নইলে এ বছরও ঈদের পর রাস্তায় চামড়া পড়ে থাকবে, আর এতিমখানার শিশুরা না খেয়ে থাকবে।
—
তথ্যসূত্র:
1. The Financial Express, ২০২৪: ঢাকায় চামড়ার দাম ১৩৫০ টাকা, মফস্বলে ১১৫০ টাকা
2. The Business Standard, ২০২৪: ছাগলের চামড়া ৫-১০ টাকা, অনেক চামড়া ফেলে দেওয়া হয়েছে
3. The Daily Star, ২০২৫: CETP ব্যর্থতায় ১০ বছরে চামড়া রপ্তানি ৬৪% কমেছে
4. The Business Standard, ২০২৫: LWG সার্টিফিকেশন না থাকায় বছরে ৫০০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতি
5. Export Promotion Bureau, FY২০২৪-২৫: মোট লেদার ও ফুটওয়্যার রপ্তানি ১.৬৭ বিলিয়ন ডলার
6. সিপিডি স্টাডি ২০২৫: ২১% চামড়া খারাপ কাটার কারণে ৪৩% কম দামে বিক্রি।